নিউক্লিয়ার এ্যানর্জি: চেনা জানা কিছু অজানা কথা-1

এক সময়ে গ্রামের বাসায় আঙিনায় বসে যখন কারেন্ট চলে যেতো তখন আধারে নিরেট বোকা চাঁদ টাকে খুব উদাস ভাবে দেখতাম। মাঝে মাঝে দক্ষিণা হাওয়া ছুয়ে যেতো সারাটা দেহ, শিহরণ জাগাতো প্রতিটা মূহুর্তে। অথবা বৃষ্টির রাতে কারেন্ট চলে গেলে খাতা মুড়ি দিয়ে টিনের চালে বৃস্টি পড়ার শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যাওয়া, এসব দিন গুলো সত্যিই নস্টালজিক। হয়তো এখনও কেউ কেউ বয়সকালে ছোটবেলার এসব স্মৃতি চাংগা করতে বাড়ী বানায় দেশের বাড়ীতে এবং থাকার ব্যাবস্হা নেয়।কিন্তু বৃষ্টি পড়ুক না পড়ুক, চাদ হাসুক না হাসুক, বিদ্যুৎ চলে গেলে মাথা সপ্তমে চড় যায়, গালাগালি শুরু বাংলাদেশের সরকার থেকে আর শেষ করে এদেশের মানুষের স্বভাবের দুর্নীতিতে!

তার মানে একটা জিনিস বোঝা যাচ্ছে আমরা মুখে যতই বলি দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি চরমে আর এর প্রয়োজনীয়তা ঢুকে গেছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে, কিন্তু উত্তরনের পথ সহজে কেউ দেখাতে চাচ্ছেন না বা সমস্যার সমাধান কেউ ঘাড় পেতে দিচ্ছনও না। এমন নয় যে পাওয়ার জেনারেশন বাড়ছে না অথবা জেনারেশন বন্ধ থাকছে কিন্তু জেনারেশনের সাথে সাথে এর ভোগের পরিমাণ বাড়ছে চক্রবৃদ্ধি হারে। এটা এদেশে নয়, সারা বিশ্বে! মানুষের এগিয়ে যাবার জন্য বিদ্যুৎ মৌলিক চাহিদায় ঢুকে যাচ্ছে আর চিন্তায় আস্তে আস্তে করে ঢুকছে পাওয়ার প্লান্ট বসানোর কথা। কিন্তু এখানেও সমস্যা।
এক সময় মনে করতাম এত পানি দিয়ে কি হবে, গাছ দিয়ে কি হবে, দক্ষিণ মেরু বা উত্তর মেরুর বরফ দিয়ে কি হবে? কিন্তু যখন গরমে প্রচন্ড গরম পরে, বা সিডরের মতো ঝড় সারা দেশ উড়িয়ে দুর্ভিক্ষ লাগিয়ে দেয়, যখন চাল কেনার পর আর কিছু কেনা যায় না, তখন মানুষ বুঝে কিছু একটা খারাপ হচ্ছে। আর সে খারাপ কিছু একটা হচ্ছে গ্রীন হাউস গ্যাস বা কার্বন ডাই অক্সাইড যেটার কারনে বিশ্বে ঘটছে একের পর এক দুর্যোগ।

বিদ্যুৎ এর ঘাটতি:নিরাপদ সমাধান আছে কি?

তাহলে বলা যায় এর সাথে নিউক্লিয়ার এ্যানর্জির সম্পর্ক কি?

তাহলে একটু বিশ্লেষণ মূলক উত্তরে যাই। কয়লা আমাদের দেশে সবচেয়ে সহজলভ্য জ্বালানী যেটা দিয়ে আমরা একটা বড় প্রোডাকশনে যেতে পারি কিন্তু এই কয়লাই হচ্ছে কার্বন ডাই অক্সাইডের সবচেয়ে বড় আধার। অনেকে আবার তখন বলে বসে তাহলে প্রাকৃতিক গ্যাস! প্রাকৃতিক গ্যাসে আসলেই কার্বনডাইঅক্সাইডের পরিমান কম আর অকটেন নম্বর বেশী থাকার কারনে অল্প ব্যাবহারেই বেশী বিটিইউ পাওয়া যায়। তবে সমস্যা থেকেই যায় এ গ্যাসের মধ্যে কার্বন সমৃদ্ধ গ্যাসের পরিমাণই বেশি (মিথেন, সালফার ইত্যাদি) আর দিন যাবে এর দামও বৃদ্ধি পাবে বিলুপ্তির সম্ভাবনা বাড়ার সাথে সাথে । আবার এখনতো আবার শোনা যাচ্ছে যে গ্যাস আছে আর যেরকম ব্যাবহার চলছে হয়তোবা বছর 10 এর মধ্যে সব গ্যাস হাওয়ায় উড়ে যাবে। তাহলে এসব দিয়ে পাওয়ার স্টেশনে ঢুকালে হয়তো গ্যাস শেষ হবার পর মানুষ গ্যাসের বদলে সব গাছ কেটে ইলিশ ভাজা খাবে।আর গ্রীন হাউস গ্যাস পাওয়ার স্টেশন ভিতর বাইর দুজায়গা থেকেই বেড়োবে আর পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্র বলতে যেকোনো সচেতন নাগরিকই বুঝতে পারেন এটা সবসময়ই একটা লস প্রজেক্ট!তবে এই ফসিল ফুয়েল দিয়ে কাজ করলে প্রচুর পরিমাণে এরকম দূষন হবেই এবং ঠেকানো যাবে না যদিও বা এর উপর ট্যাক্স নেয়া হয়।

nuclear-power-plant নিউক্লিয়ার এ্যানর্জি: চেনা জানা কিছু অজানা কথা-1
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের ছবি

সেদিক দিয়ে নিউক্লিয়ার পাওয়ার স্টেশন একেবারেই নিরাপদ যদিও জনগন এখনো ভোলেনি সেই চেরোনোবিল বা থ্রীমাইল দ্বীপের দুর্ঘটনা।
আরেকটা পরিসংখ্যান দেই, 2050 সাল নাগাদ সারা বিশ্বে 160 শতাংশ ইলেক্ট্রিসিটির ব্যাবহার বেড়ে যাবে। এপরিমান বিদ্যুৎ চাহিদার জন্য যে কয়েক হাজার পাওয়ার স্টেশন বানাতে হবে তখন হয়তো আকাশে চোখ তুললে গ্রীন হাউস গ্যাসের স্তর দেখা যাবে। তবে 100 টা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট বসালে এ সমস্যার একটা আশু সমাধান পাওয়া যাবে। আর সেক্ষেত্রে এর মূল্য খুবই কম থাকবে ওসব প্রাকৃতিক জ্বালানীর বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে 2000 সালের পর থেকে শুধু প্রাচ্যে 20000 মেগাওয়াটের বেশী বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে যেটা মূলত নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট থেকেই আসছে।

diablocanyon-northranch-april2007 নিউক্লিয়ার এ্যানর্জি: চেনা জানা কিছু অজানা কথা-1

এ ব্যাপারে 2003 সালে এমআইটির একটা স্ট্যাডিতে (The future of Nuclear Power) দেখা গেছে 2050সাল নাগাদ নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন তিনগুন বেড়ে 10 লক্ষ মেগাওয়াটে গিয়ে দাড়াবে, যেটা মূলত পৃথিবীর বায়ুমন্ডলকে প্রতিবছর 0.8 বিলিয়ন থেকে 1.8 বিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপাদন থেকে বাচাবে সেটার উৎস যেটাই হোউক; গ্যাস বা কয়লা!এ হিসাবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট অবশ্যই এই গ্রীন হাউস গ্যাসের হাত থেকে এ পৃথিবীকে বাচাতে পারবে যেটা হিসেব করলে দেখা যায় 700 কোটি টন কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস 2050 সাল নাগাদ!

সূত্র মতে: “A plan to keep Carbon in Check” by Robert H. Scolow and Stephen W. Pacala, page 50

চলবে….



মোট ৭ টি মন্তব্য করা হয়েছে

  1. সুপেরিওর সোহান

    বরাবরের মত এবার ও একটি অসাধারণ লেখা পেলাম রিন ভাইয়ার কাছ থেকে। কিন্তু ভাইয়া প্রকল্পগুলো দেখে আমার খুবই ব্যায়বহুল মনে হচ্ছে। আমাদের দেশে এর সম্ভাবনা কতটুকু? আর ভাইয়া আপনি বলেছেন যে নিউক্লিয় উপায়ে পাওয়ারপ্লান্ট এ গ্রীনহাউস প্রতিক্রিয়া কমে আসবে। কিন্তু এই ব্যায়বহুল পাওয়ারপ্ল্যান্ট পরিপূর্ণভাবে চালু হতে হতে পৃথিবীর জলবায়ু কতটুকু ই বা অক্ষত থাকবে? আমাদের সুন্দর পৃথিবী ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা কতটুকু?
    আশা করি দ্বিতীয়পর্বে এই প্রশ্নের উত্তর গুলো পাবো।
    ধন্যবাদ।

  2. মেহেদী হাসান

    আচ্ছা নিউক্লিয়ার এনার্জি না হয় ব্যয়বহুল, উইন্ড মিলের মাধ্যমে কী বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যয়বহুল? অনেক দেশেই তো উইন্ড মিল আছে। আমাদের দেশে নেই কেন? আছে কি?

  3. অশ্রুগুলো রিনকে দেয়া

    আমরা যারা এদেশে শিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিত তারা দেখা যায় একটা লেভেল পর্যন্ত পড়ালেখা করেও অনেক ভ্রান্ত ধারনা নিয়ে বাস করি এই সমাজে এবং মাঝে মাঝে দেখা যায় অনেক পাবলিক সিম্পোজিয়াম এসব ভ্রান্তধারনা প্রকাশ করতেও দ্বীধা বোধ করি না। তবে দোষ অবশ্য এদের না, দোষ হলো উপযুক্ত তথ্যের অভাব। বাংলাদেশে যখন নিউক্লিয়ার এ্যানর্জি নিয়ে কথা হচ্ছিলো তখন এক সভায় এক বুদ্ধিজীবিকে সমানে গালাগালি করতে দেখলাম। তখন মনে হয়েছিলো সবকিছুই সে যুক্তিযুক্ত বলছে।

    তবে আমি যখন বিভিন্ন সায়েন্টিফিক এবং ইন্জ্ঞিনিয়ারিং জার্নালে সদস্য হবার সুবাধে আরো পড়তে এবং জানতে শুরু করলাম, তখন মনে হলো এসব ভ্রান্ত এবং সেকেলে ধারনা গুলোকে অবশ্যই দূর করতে হবে।আমি এদেশের বেশ কিছু বড় বড় পাওয়ার প্লান্ট ঘুরেছি তাদের অপারেশন আর ট্রাবলশূটিং খুব কাছ থেকে দেখেছি।দেখলে হাসি পায় কেনো এসব ভাঙগাড়ী হিসেবে বিক্রি করে দিচ্ছে না!
    না, নিউক্লিয়ার এনার্জি মোটেও ব্যাবয়বহুল না আর একটা পাওয়ার প্লান্ট লাভবান হবে বা ব্যায়বহুল এটার হিসেবটাও অনেকটা অন্যরকম মানে সাধারন বিবিএ বা বিজনেস এ্যাডমিনের শিক্ষা দিয়ে করা যায় না। এজন্য ইন্জ্ঞিনিয়ার হতে হয় তাকে এবং বাজারের কিছু বই ঘাটলেই বোঝা যাবে এর হিসাবটা কিরকম। সেক্ষেত্রে দেখা গেছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের লাইফ সাইকেল আর প্রোডাক্টিভিটি চিন্তা করলে (যদিও ক্যাপেক্স/ওপেক্স একটু বেশী আদর্শ প্লানিং এর ক্ষেত্রে), এটা খুবই সাশ্রয়ী এবং প্রচন্ড রকমের লাভজনক ব্যাবসা (অনেকটা বাংলাদেশের টেলিকম বিজনেসের মতো)!
    তবে এটা ঠিক নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের কালো দিক গুলো তো অবশ্যই আছে যেগুলো নিয়েই হবে আমার মূল আলোচনা!
    আস্তে আস্তে লেখা গুলো দিলে ব্যাপারগুলো পরিস্কার হবে আশা করি! মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ সবাইকে

  4. অশ্রুগুলো রিনকে দেয়া

    আমাদের দেশের মতো ঘনবসতী পূর্ন এলাকায় উইন্ডমিলের উদাহরন অনেকটা হবে এক মুঠো জমির ফসলে দিয়ে সারা গ্রামের ফসল দেয়ার মতো অবস্হা। কুতুবদিয়ার উদাহরন তো সব জায়গায় খাটানো সম্ভব না!

  5. সুপেরিওর সোহান

    মাফ করবেন রিন ভাইয়া, আপনি নিজেও একটি ভ্রান্ত ধারনা ধারন করে আছেন। ভ্রান্ত ধারনা কাররই কাম্য নয়। না আপনার, না আমার। এটা আমাদের সিস্টেমের আশির্বাদ! তবুও আপনার মত মানুষরা আমাদের জানাচ্ছন বলেই আজ আমরা অনেক কিছুই জানতে পারছি।

    ধন্যবাদ ভাইয়া।

  6. শফিউল

    তাহলে আমাদের দেশে কেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার সোর্স হচ্ছে না?

  7. অশ্রুগুলো রিনকে দেয়া

    @শফি ভাই, প্রশ্ন সুন্দর করেছেন কিন্তু উত্তর জানা নাই। আমারও এরকম একটা প্রশ্ন আছে জোটসরকার 5 বছরে পাওয়ার প্লান্ট বসিয়েছে মাত্র 80 মেগাওয়াটের একটি যেটা উদ্বোধনের 72 ঘন্টা পর বন্ধ হয়ে যায়। যেখানে আমাদের চাহিদা বাড়ছে পাগলা ঘোড়ার মতো। তারা কেনো এমন করলো?
    আবার বাংলাদেশের গ্যাস চালিত পাওয়ার স্টেশন গুলো বিভিন্ন ছল ছুতোয় (গ্যাস নাই, টারবাইন নস্ট, জেনারেটরের ব্লেড, গেছে, করোশন ইত্যাদি) বছরের 5-6 মাস বন্ধ থাকে, ব্যাবসায়িক দিক দিয়ে লস করে আশেপাশের পরিবেশে বিপর্যয় ডেকে এনেছে (আমরা এটা টের পাইনা কারন ওগুলো যেখানে বসানো হয়েছে সেগুলো আমাদের লোক চক্ষুর অন্তরালে আর যারা ওখানে থাকে তারাই জানে কত জ্বালা ঐখানে), তবু আমরা চুক্তি করি ওসব ভাঙ্গাচূড়া কোম্পানীর সাথে ফের এরকম একটা বসানোর জন্য কেনো এমন হবে?

    আসলে অনেক প্রশ্নের উত্তর জানি না, যেখানে ইন্ডিয়ার মতো দেশ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আরো 4টা নিউক্লিয়ার প্লান্ট রাশিয়ার সাথে বসাচ্ছে।

    এজন্যই আমি মাঝে মাঝে বুদ্ধিজীবি আর নীতিনির্ধারকদের কথা শুনে অবাক হয়ে যাই, এরা ডক্টরেট করলো কিভাবে? আশা করি বুঝতে পেরেছেন আমি কি বোঝাতে চাচ্ছি আর বাকি সকল উত্তর পরবর্তী পোস্টে পরিসংখ্যান আর উদাহরন সহই তুলে ধরা হবে!

আপনার মন্তব্য দিন